ভারতকে শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক শক্তি অভিহিত করে নয়াদিল্লি-ব্রাসেলসের কৌশলগত সম্পর্কের প্রশংসায় - বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী বার্ট ডি ওয়েভার
— গ্লোবাল জার্নাল | নয়াদিল্লি, ভারত | ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ভারতকে একটি “বড় ভূরাজনৈতিক শক্তি” হিসেবে অভিহিত করে নয়াদিল্লির সঙ্গে ব্রাসেলসের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী বার্ট ডি ওয়েভার। তিনি বলেছেন, ভারতের প্রভাব এখন আর শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় সীমাবদ্ধ নেই; বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি ও প্রযুক্তিতেও দেশটির গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।
নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ডি ওয়েভার বলেন, গত দুই দশকে ভারত ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে এবং মোদির নেতৃত্বে দেশটি দ্রুত একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
দুই দশক পর প্রথম কোনো বেলজিয়াম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভারত সফরকে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই সময়ের মধ্যে ভারত “অসাধারণভাবে পরিবর্তিত” হয়েছে।
ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখছে বেলজিয়াম
ডি ওয়েভার বলেন, ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের পাশাপাশি একটি দ্রুতবর্ধনশীল বড় অর্থনীতি, “অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত শক্তিধর দেশ” এবং এমন একটি “বড় ভূরাজনৈতিক শক্তি”, যার কণ্ঠস্বর দক্ষিণ এশিয়ার সীমানার অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে।
তার মতে, এ কারণেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বেলজিয়ামের জন্য ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
তিনি বলেন, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত—তিন ক্ষেত্রেই ভারত-বেলজিয়াম সম্পর্ক আরও গভীর করার প্রয়োজন রয়েছে।

প্রযুক্তি ও ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের সুযোগ
বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারতের তুলনায় আয়তন ও জনসংখ্যায় ছোট হলেও বেলজিয়াম বিশ্বের অন্যতম উন্মুক্ত ও আন্তর্জাতিকভাবে সংযুক্ত অর্থনীতি।
তিনি বলেন, প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ জনসংখ্যা নিয়ে বেলজিয়াম বিশ্বের ২৫তম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে দেশটি একটি গেটওয়ে হিসেবে কাজ করতে পারে।
ডি ওয়েভার বলেন, ভারত দিতে পারে “অসাধারণ পরিসর, মেধা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা”, আর বেলজিয়াম দিতে পারে প্রযুক্তি, বিশেষায়িত দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং ইউরোপে প্রবেশাধিকার।
ঐতিহ্যগত হীরা বাণিজ্যের বাইরে এখন দুই দেশ প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি এবং কৌশলগত সরবরাহব্যবস্থায় সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী।
পাঁচ বছরে বাণিজ্য দ্বিগুণ করার লক্ষ্য
বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জানান, ভারত ও বেলজিয়াম আগামী পাঁচ বছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য দ্বিগুণ করার লক্ষ্যে কাজ করবে।
ভারতীয় সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩.০১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। একই সময়ে ভারতে বেলজিয়ামের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪.২ বিলিয়ন ডলার।
বাণিজ্য দ্বিগুণ হলে দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ২৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে।
বেলজিয়ামের কোম্পানিগুলোর জন্য ভারত একটি Investment Fast-Track Mechanism চালু করেছে বলেও মোদি জানান। পাশাপাশি India-Belgium Business Forum-কে আরও নিয়মিত কার্যক্রমের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দুই দেশ আর্থিক, ফিনটেক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যেও সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়ে কাজ করবে।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় নতুন মাত্রা
ডি ওয়েভার বলেন, ভারত সফর শুধু বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে নয়; বর্তমান বিশ্বের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা ক্রমেই পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে।
এই কৌশলগত গুরুত্বের প্রতিফলন দেখা যায় ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং এবং বেলজিয়ামের প্রতিরক্ষা ও বৈদেশিক বাণিজ্যমন্ত্রী থিও ফ্রাঙ্কেনের বৈঠকেও।
নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে দুই দেশের প্রতিরক্ষা ও প্রতিরক্ষা-শিল্প সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সংলাপ, উচ্চপর্যায়ের সফর, প্রশিক্ষণ এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হয়।
এ ছাড়া আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা হয়।
দিল্লি-ব্রাসেলস সম্পর্কের বিস্তৃত পরিধি
ভারত ও বেলজিয়ামের সহযোগিতা এখন হীরা ও প্রচলিত বাণিজ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, কৌশলগত সরবরাহব্যবস্থা ও ভূরাজনৈতিক সহযোগিতার দিকে বিস্তৃত হচ্ছে।
বেলজিয়ামের পক্ষ থেকে ভারতকে ইউরোপের সঙ্গে সংযোগকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার এবং নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে ব্রাসেলসকে ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশের একটি সম্ভাবনাময় অংশীদার হিসেবে দেখার প্রবণতা দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন কৌশলগত মাত্রা দিতে পারে।
— গ্লোবাল জার্নাল | নয়াদিল্লি, ভারত | ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সূত্র: ভারতীয় সরকারি তথ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদ প্রতিবেদন





