ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় আমেরিকা থেকে স্বর্ণ সরিয়ে নিচ্ছে ইউরোপের দেশগুলো
আমস্টারডাম, নেদারল্যান্ডস | ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | The Global Journal
বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বাণিজ্যিক সংঘাত, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও নিষেধাজ্ঞার পরিবেশে ইউরোপের কয়েকটি দেশ নিজেদের স্বর্ণের রিজার্ভ কোথায় সংরক্ষণ করবে, সে বিষয়ে নতুন করে কৌশল নির্ধারণ করছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ নেদারল্যান্ডস—দেশটি উত্তর আমেরিকায় সংরক্ষিত স্বর্ণের একটি অংশ লন্ডনে স্থানান্তর করেছে।
নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় সংরক্ষিত প্রায় ৩১৩ টন স্বর্ণের মধ্যে ৮৬ টন লন্ডনে স্থানান্তর করা হয়েছে। ব্যাংকটির ভাষ্য অনুযায়ী, ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে স্বর্ণকে এমন একটি স্থানে রাখা হয়েছে, যাতে গুরুতর সংকট দেখা দিলে তা দ্রুত ব্যবহার বা লেনদেন করা সম্ভব হয়।
তবে ডাচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তকে কোনো আসন্ন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন রিজার্ভ সম্পদের নিরাপত্তা, তারল্য, ভৌগোলিক বৈচিত্র্য এবং সংকটকালীন ব্যবহারযোগ্যতা আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।

নেদারল্যান্ডসের কৌশলগত পদক্ষেপ
ডাচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্টের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে সরিয়ে নেওয়া স্বর্ণ বর্তমানে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ভল্টে সংরক্ষিত রয়েছে।
ডাচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ওলাফ স্লেইপেন বলেছেন, স্বর্ণ ভবিষ্যতে ব্যবহারের প্রয়োজন না হওয়ারই প্রত্যাশা রয়েছে। তবে যেকোনো গুরুতর পরিস্থিতির জন্য দেশের স্থিতিস্থাপকতা ও প্রস্তুতি জোরদার করা প্রয়োজন।
লন্ডনকে বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ হলো আন্তর্জাতিক স্বর্ণবাজারে এর গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান। কোনো সংকটের সময় দ্রুত স্বর্ণ কেনাবেচা বা আর্থিক লেনদেনের প্রয়োজন হলে লন্ডন বিশ্বের অন্যতম কার্যকর কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়।
ইউরোপে রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন
নেদারল্যান্ডসের পদক্ষেপটি ইউরোপের বৃহত্তর রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা প্রবণতার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
ফ্রান্স চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাদের কিছু স্বর্ণের রিজার্ভ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে। এর আগে জার্মানির বুন্ডেসব্যাংক ২০১৬ সালের মধ্যে বিদেশি সংরক্ষণাগার থেকে ২১৬ টনের বেশি স্বর্ণ জার্মানিতে স্থানান্তর করে। এর মধ্যে নিউইয়র্ক থেকে ১১১ টন এবং প্যারিস থেকে ১০৫ টন স্বর্ণ ফিরিয়ে আনা হয়েছিল।
ইতিহাসেও আন্তর্জাতিক অস্থিরতার সময় স্বর্ণের অবস্থান পরিবর্তনের নজির রয়েছে। শীতল যুদ্ধের সময় ইউরোপের কয়েকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের স্বর্ণের একটি অংশ নিউইয়র্কে স্থানান্তর করেছিল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে অবশ্য চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। এখন শুধু নিরাপত্তা নয়, স্বর্ণের দ্রুত লেনদেনযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকারও রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

লন্ডন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
লন্ডন দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের অন্যতম প্রধান স্বর্ণবাজার ও সংরক্ষণকেন্দ্র। মধ্য লন্ডনে অবস্থিত প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ভল্টে প্রায় চার লাখ স্বর্ণের বার সংরক্ষিত রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব স্বর্ণের সম্মিলিত মূল্য ২০০ বিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি বলে জানা যায়।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক অব ইংল্যান্ড এখনও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে অন্যতম জনপ্রিয় স্বর্ণ সংরক্ষণ কেন্দ্র। তবে একই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের স্বর্ণ বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলে ছড়িয়ে রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের গবেষণা বিশ্লেষকদের মতে, কোনো দেশের স্বর্ণ কোথায় রাখা হবে—এটি এখন রিজার্ভ ব্যবস্থাপকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সব স্বর্ণ শারীরিকভাবে স্থানান্তর করা হয়নি
নেদারল্যান্ডসের ক্ষেত্রে পুরো স্বর্ণ সরাসরি উত্তর আমেরিকা থেকে লন্ডনে পরিবহন করা হয়নি।
প্রায় ৫৯ টন স্বর্ণ নিউইয়র্কে বিক্রি করে লন্ডনে সমপরিমাণ নতুন স্বর্ণ কেনা হয়েছে। ফলে ওই পরিমাণ স্বর্ণের শারীরিক পরিবহনের প্রয়োজন হয়নি।
অন্যদিকে ২৭ টনের বেশি স্বর্ণ যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে নেদারল্যান্ডসের জাইস্ট শহরে স্থানান্তর করা হয়। পরে সমপরিমাণ স্বর্ণ জাইস্ট থেকে লন্ডনে পাঠানো হয়েছে।
স্বর্ণের আন্তর্জাতিক পরিবহন অত্যন্ত নিরাপত্তা-নির্ভর একটি প্রক্রিয়া। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত নিরাপত্তাজনিত কারণে পরিবহনের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণের চাহিদা
সীমান্ত পেরিয়ে স্বর্ণ পরিবহনের অন্যতম প্রতিষ্ঠান ব্রিংক'স গ্লোবাল সার্ভিসেস জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে স্বর্ণ পরিবহনের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট নাদের আন্তার বলেন, ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি এবং কৌশলগত রিজার্ভ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের গুরুত্ব বাড়ার কারণে এই প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
অন্যদিকে ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ বাজার কৌশলবিদ জোসেফ কাভাতোনি মনে করেন, যুদ্ধ ও বাণিজ্যিক উত্তেজনা কিছু ক্ষেত্রে স্বর্ণের অবস্থান পরিবর্তনের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেললেও এগুলো একমাত্র বা প্রধান কারণ নয়। মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার এবং দ্রুত লেনদেনযোগ্য স্থানে স্বর্ণ রাখার প্রয়োজনীয়তাও গুরুত্বপূর্ণ।

কাভাতোনির মতে, এসব পদক্ষেপকে কোনো আসন্ন বিপর্যয়ের প্রত্যক্ষ সংকেত হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের রিজার্ভ সম্পদ কীভাবে আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা, সুরক্ষা ও ব্যবহার করা যায়, সে বিষয়ে নতুন করে কৌশল নির্ধারণ করছে।
আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে এর তাৎপর্য
বর্তমান আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় স্বর্ণ শুধু একটি মূল্যবান ধাতু নয়; এটি অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে একটি কৌশলগত রিজার্ভ সম্পদ। ভূরাজনৈতিক সংঘাত, বাণিজ্যিক বিরোধ, নিষেধাজ্ঞা, মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়লে রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় স্বর্ণের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
নেদারল্যান্ডসের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ সেই পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক বাস্তবতার একটি উদাহরণ। ইউরোপের কয়েকটি দেশ বিদেশে সংরক্ষিত স্বর্ণের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করছে, একই সঙ্গে লন্ডনের মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্রেও রিজার্ভ রাখছে—যাতে প্রয়োজনের সময় নিরাপত্তা ও দ্রুত লেনদেনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা যায়।
তবে এই প্রবণতাকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতার ঘোষণা বা আসন্ন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধসের পূর্বাভাস হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। বরং বর্তমান আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ায় এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ বৈচিত্র্যকরণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং সংকটকালীন প্রস্তুতি বৃদ্ধির একটি কৌশলগত প্রবণতা হিসেবে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
---BBC News





