আঞ্চলিক শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ভারতের প্রভাব কাজে লাগাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান
বিশকেক, কিরগিজস্তান | ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আঞ্চলিক সংঘাতের অবসান এবং শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ভারতের কূটনৈতিক প্রভাব ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে যুদ্ধ ও রক্তপাতের পরিবর্তে সংলাপ, কূটনীতি এবং আলোচনার মাধ্যমে আঞ্চলিক সংকট নিরসনে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে অনুষ্ঠিত সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন (SCO) শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে সোমবার দুই নেতার বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে পশ্চিম এশিয়ার চলমান পরিস্থিতি, আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা এবং ভারত-ইরানের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে মতবিনিময় করেন তারা।
ইরানি প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে প্রকাশিত বৈঠকের বিবৃতিতে বলা হয়, সাম্প্রতিক যুদ্ধের সময়ে ইরানের প্রতি ভারতের সমর্থন ও সহযোগিতার জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে অঞ্চলটিতে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরও জোরদারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন।
ভারতের কূটনৈতিক ভূমিকার ওপর জোর
পেজেশকিয়ান বলেন, তাঁর প্রশাসনের শুরু থেকেই ইরান আঞ্চলিক সমস্যাগুলো সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার পরিবর্তে শক্তি প্রয়োগের পথ বেছে নিয়েছে।
ইরানের প্রেসিডেন্টের মতে, তেহরান এখনও সমঝোতার মাধ্যমে সংকট নিরসনে প্রস্তুত। অব্যাহত যুদ্ধ কোনো পক্ষের স্বার্থেই নয়; বরং এর ফলে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা আরও বাড়তে পারে।
বৈঠকে পেজেশকিয়ান ভারতের আন্তর্জাতিক অবস্থান এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নয়াদিল্লির বিস্তৃত কূটনৈতিক যোগাযোগের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী মোদিকে আহ্বান জানান, ভারত যেন তার প্রভাব ও যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে যুদ্ধ ও রক্তপাতের পথ থেকে সরে এসে সংলাপ ও সমঝোতার পথে ফিরতে উৎসাহিত করে।

শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভারতের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত মোদির
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বৈঠকে বলেন, ভারত ইরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে আগ্রহী। তিনি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য আরও সম্প্রসারণ ও বহুমুখী করার ওপর গুরুত্ব দেন।
মোদি বলেন, ভারত পশ্চিম এশিয়ায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সব ধরনের প্রচেষ্টাকে সমর্থন অব্যাহত রাখবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক সংকটের সমাধানে সংলাপ ও কূটনীতির গুরুত্বের ওপরও জোর দেন।
দুই নেতা ভারত-ইরান সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়েও আলোচনা করেন। মোদি ভারত ও ইরানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এবং ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও সহযোগিতার ক্ষেত্র বাড়ানোর কথা জানান।
চাবাহার ও হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব
বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট ছিল হরমুজ প্রণালী ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনা। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বাণিজ্যিক নৌপথ হিসেবে হরমুজ প্রণালীর স্থিতিশীলতা ভারতসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
ভারতের জন্য ইরানের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে চাবাহার বন্দরও গুরুত্বপূর্ণ। মধ্য এশিয়ার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যিক ও পরিবহন যোগাযোগ বৃদ্ধিতে চাবাহারকে দীর্ঘদিন ধরে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে নয়াদিল্লি।
বৈঠকে দুই পক্ষই ভারত-ইরান সহযোগিতার বিদ্যমান সম্ভাবনাগুলো আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেয়। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি অর্থনীতি, বাণিজ্য, পরিবহন, সামুদ্রিক সহযোগিতা এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়েও আলোচনা হয়।

আঞ্চলিক কূটনীতিতে ভারতের অবস্থান
পেজেশকিয়ানের এই আহ্বান এমন এক সময়ে এলো, যখন পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের প্রভাব আঞ্চলিক নিরাপত্তার পাশাপাশি বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ ও নৌপরিবহনের ওপরও পড়ছে।
ভারত ঐতিহাসিকভাবে ইরান, উপসাগরীয় দেশগুলো, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারের সঙ্গে একই সময়ে কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রেখে এসেছে। ফলে নয়াদিল্লির কাছে সংঘাতের বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের একটি স্বতন্ত্র কূটনৈতিক পরিসর রয়েছে।
বিশকেকে অনুষ্ঠিত মোদি-পেজেশকিয়ান বৈঠক সেই যোগাযোগের গুরুত্ব নতুন করে সামনে এনেছে। তবে ভারত বাস্তবে কতটা মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা নেবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অবস্থান, সংঘাতের গতিপথ এবং কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর।
দুই নেতার বৈঠকটি তাই শুধু ভারত-ইরান সম্পর্কের জন্য নয়, বরং পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংকটের মধ্যে সম্ভাব্য কূটনৈতিক পথ খোঁজার ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশকেক, কিরগিজস্তান | ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬





