জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বার্থে ইরান-রাশিয়া একে অপরের পরীক্ষিত ও কৌশলগত অংশীদার।দুই দেশই একে অপরকে মরিয়া হয়ে প্রয়োজন অনুভব করছে
— গ্লোবাল জার্নাল | বিশকেক, কিরগিজস্তান | ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইরান ও রাশিয়ার মধ্যকার কৌশলগত সম্পর্ক আরও দৃঢ় হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সাম্প্রতিক বৈঠকে। শাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (SCO) সম্মেলনের সাইডলাইনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দুই নেতা পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমর্থনের বিষয় তুলে ধরেন।
ক্রেমলিনের প্রকাশিত বিবৃতি অনুযায়ী, পুতিন ইরানের জনগণের প্রতি রাশিয়ার “পূর্ণ সংহতি” প্রকাশ করেন। জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় ইরানের জনগণের সাহস ও দৃঢ়তারও প্রশংসা করেন তিনি। একই সঙ্গে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা হোসেইনি খামেনির প্রতি তার শুভেচ্ছা ও আন্তরিক সমর্থনের বার্তা পৌঁছে দিতে পেজেশকিয়ানকে অনুরোধ করেন।
ইরান-রাশিয়া সম্পর্ককে কৌশলগত বললেন পেজেশকিয়ান
বৈঠকে পেজেশকিয়ান রাশিয়ার অবস্থানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। ক্রেমলিনের প্রকাশিত আলোচনার বিবরণ অনুযায়ী, যুদ্ধ, সংঘাত ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সময় রাশিয়া যে অবস্থান নিয়েছে, তার জন্য তিনি মস্কোর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান ও রাশিয়ার সম্পর্ক কৌশলগত প্রকৃতির এবং এটি শুধু সাধারণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার মতে, দুই দেশের এই সহযোগিতা একতরফা চাপ ও নিষেধাজ্ঞার মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষজ্ঞের চোখে পারস্পরিক নির্ভরতা বাড়ছে
ফক্স নিউজ ডিজিটালের সঙ্গে কথা বলার সময় ন্যাটোর সাবেক কমান্ডার ও অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন বিমানবাহিনীর জেনারেল ফিলিপ ব্রিডলাভ বলেন, ইরান ও রাশিয়ার সম্পর্ক ক্রমেই ঘনিষ্ঠ হচ্ছে এবং দুই দেশই একে অপরকে “মরিয়া হয়ে প্রয়োজন” অনুভব করছে।জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বার্থে ইরান-রাশিয়া একে অপরের পরীক্ষিত ও কৌশলগত অংশীদার
তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দুই দেশের ওপরই অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চাপ রয়েছে। তিনি দাবি করেন, রাশিয়ার জন্য ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, অন্যদিকে ইরান রাশিয়ার কাছ থেকে সামরিক প্রযুক্তি, লক্ষ্য নির্ধারণ ও গোয়েন্দা সহায়তা পেতে আগ্রহী।
ব্রিডলাভ আরও দাবি করেন, রাশিয়া ইরানের কাছে বিভিন্ন সামরিক সক্ষমতা ও প্রযুক্তি হস্তান্তর করছে। তবে এসব দাবির সবকটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
জাতিসংঘে রাশিয়ার সমর্থনের গুরুত্ব
United Against Nuclear Iran (UANI)-এর নীতি পরিচালক জেসন ব্রডস্কি বলেন, ইরান ও রাশিয়ার দীর্ঘদিনের অংশীদারত্ব উভয় দেশের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তার মতে, রাশিয়া আমেরিকার বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টির ক্ষেত্রে ইরানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখে। অন্যদিকে ইরান সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাজনৈতিক সমর্থনের জন্য রাশিয়ার ওপর নির্ভর করে।
বিশেষ করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে রাশিয়ার অবস্থান ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতেও ইরান-রাশিয়া সম্পর্কের প্রভাব
ব্রিডলাভের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ এখন অনেকাংশে ইচ্ছাশক্তির পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র আকাশ ও সমুদ্রে উল্লেখযোগ্য সামরিক সুবিধা অর্জন করলেও ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC) যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করে টিকে থাকার কৌশল অনুসরণ করতে পারে।
তার বিশ্লেষণে, হরমুজ প্রণালিকে হুমকির মুখে রাখা হলে সামুদ্রিক বিমা ব্যয় ও আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের খরচ বেড়ে যেতে পারে, যার প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।

রাশিয়া-ইরান ঘনিষ্ঠতায় বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বার্তা
সাম্প্রতিক বৈঠক ও পারস্পরিক বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, মস্কো ও তেহরানের সম্পর্ক এখন শুধু দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আঞ্চলিক নিরাপত্তা, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলা, সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে পারস্পরিক সমর্থন—সব ক্ষেত্রেই এই সম্পর্কের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ছে।
একই সঙ্গে এই ঘনিষ্ঠতা যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সমীকরণেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ইরান-রাশিয়া অংশীদারত্ব যত গভীর হবে, পশ্চিমা শক্তিগুলোর জন্য মধ্যপ্রাচ্যে কৌশলগত চাপ সামলানো তত বেশি জটিল হয়ে উঠতে পারে।
তবে সামরিক সহযোগিতা ও প্রযুক্তি হস্তান্তরসংক্রান্ত বিভিন্ন দাবির ক্ষেত্রে পৃথকভাবে নির্ভরযোগ্য যাচাই প্রয়োজন।
— গ্লোবাল জার্নাল | বিশকেক, কিরগিজস্তান | ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সূত্র: Kremlin, Fox News Digital এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ প্রতিবেদন





