মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান নিষেধাজ্ঞায় অর্থনৈতিক সংকট সমাধানে ভারতসহ ব্রিকসের দেশ গুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে মনোযোগী ইরান
তেহরান, ইরান | ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞার মধ্যে নিজেদের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় ভারতসহ ব্রিকস সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ও সহযোগিতা আরও জোরদারের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান।
ব্রিকস সম্মেলনকে সামনে রেখে তেহরানের প্রত্যাশা, অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা এবং ভারত-ইরান সম্পর্ক নিয়ে ফার্স্টপোস্টের সঙ্গে কথা বলেছেন ইরানি নীতি বিশেষজ্ঞ ও তেহরান পলিটেকনিক ইউনিভার্সিটির পাবলিক পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্সের সহকারী অধ্যাপক ড. সাইয়েদ মোহাম্মাদ সাদেক ইমামিয়ান।
যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও স্থিতিস্থাপক ইরান
ইমামিয়ানের মতে, সাম্প্রতিক যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকট ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেললেও দেশটির সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংকট মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলা ইরানের জনগণের মধ্যে জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার বিষয়ে ঐক্য তৈরি করেছে। যুদ্ধের শুরুতেই শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতা ও সামরিক কমান্ডারদের হত্যার মতো বড় ধাক্কার পরও ইরানের সামরিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ইমামিয়ান আরও বলেন, ইরানের সরকারি প্রশাসন কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর অতিরিক্তভাবে নির্ভরশীল নয় এবং যুদ্ধের মধ্যেও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা কার্যকর রয়েছে।

নৌ অবরোধে তেল খাত নিয়ে উদ্বেগ
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নৌ অবরোধ অব্যাহত থাকলে ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ইমামিয়ান। বিশেষ করে দেশটির তেল শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি পুরো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি খাতেও এর বড় প্রভাব পড়তে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তার মতে, ইরানের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও বিভিন্ন একতরফা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মুখোমুখি হওয়ায় দেশটি কিছুটা অভিযোজন ক্ষমতা অর্জন করেছে। তবে নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনেও এর বড় অর্থনৈতিক চাপ পড়েছে বলেও স্বীকার করেন তিনি।
‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নিয়ে ইরানের মূল্যায়ন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ প্রসঙ্গে ইমামিয়ান বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করেছে। তার মতে, নতুন নীতির একটি বড় অংশ বাস্তব অর্থনৈতিক পদক্ষেপের পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক ও তথ্যযুদ্ধের ওপর নির্ভর করছে।
২০১৮ সালের ‘ম্যাক্সিমাম প্রেসার’ নীতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে তাদের হাতে থাকা বেশিরভাগ অর্থনৈতিক হাতিয়ার ব্যবহার করেছে বলে তেহরানে ধারণা রয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক উদ্যোগে যুক্ত হলেও এর বাস্তব প্রভাব খুব বেশি হবে না বলে মনে করেন ইমামিয়ান। তার মতে, ইউরোপ ইতোমধ্যে ইরানের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তবে রাজনৈতিকভাবে ইউরোপের এমন অবস্থান ইরানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করতে পারে।
বিকল্প অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্রিকস
ইমামিয়ানের মতে, ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (SCO) মতো বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মগুলো গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর কাছে আগের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, এসব প্ল্যাটফর্ম যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা বাণিজ্যনীতি, শুল্ক এবং ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপের কারণে ব্রিকসের মতো প্ল্যাটফর্মের গুরুত্ব বেড়েছে।
তবে ব্রিকসের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি। কয়েকটি সদস্য দেশ এখনো অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নেওয়ায় সংগঠনটির বিকল্প অর্থনৈতিক সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন ইমামিয়ান।
ইরানের দৃষ্টিতে ব্রিকস ও এসসিও শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বাইরে একটি সহায়ক আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সম্ভাব্য সুযোগ হিসেবেও এগুলোকে দেখছে তেহরান।
ভারতের কাছ থেকে ইরানের প্রত্যাশা
ইমামিয়ান বলেন, ইরান ও ভারতের সম্পর্কের ঐতিহাসিক ও সভ্যতাগত ভিত্তি বহু পুরোনো। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের কিছু ক্ষেত্রে দুর্বলতা দেখা দিয়েছে।
তার মতে, ভারতের ইরানি তেল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং সামগ্রিক ভারত-ইরান বাণিজ্যেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও ইরানের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তবে তেহরান এখনো ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করতে আগ্রহী বলে জানান ইমামিয়ান। বিশেষ করে ব্রিকসের সভাপতিত্বে ভারতের অবস্থানকে গ্লোবাল সাউথের বৃহত্তর স্বার্থে কাজে লাগানোর একটি সুযোগ হিসেবে দেখছে ইরান।
ইমামিয়ান আশা প্রকাশ করেন, ব্রিকসের নেতৃত্বে ভারত গ্লোবাল সাউথের মূল্যবোধ ও অভিন্ন স্বার্থকে গুরুত্ব দেবে এবং তুলনামূলকভাবে স্বাধীন অবস্থান থেকে বহুপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদারে ভূমিকা রাখবে।
সূত্র: ফার্স্টপোস্ট





