ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বদলাচ্ছে বৈশ্বিক এজেন্ডা, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি-স্থিতিশীলতা রক্ষায় ভারতে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন
নয়াদিল্লি, ভারত | ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
ইরান যুদ্ধ, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার মধ্যে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী ১৮তম ব্রিকস নেতৃবৃন্দের সম্মেলন। এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর নেতাদের অংশগ্রহণে এবারের সম্মেলনে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি, বহুপাক্ষিকতা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ সপ্তম মাসে এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পঞ্চম বছরে প্রবেশ করায় সংঘাতগুলোর প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও পড়ছে। জ্বালানি সরবরাহ ও নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে ব্রিকসের এবারের বৈঠককে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সম্মেলনের আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আশা প্রকাশ করেন, বৈঠকে ইতিবাচক ও অর্থবহ আলোচনা হবে। চীনও জানিয়েছে, মতপার্থক্য নিরসনে সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় ব্রিকস দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করতে তারা আগ্রহী।

বিস্তৃত হচ্ছে ব্রিকসের পরিধি
১৮তম সম্মেলনে ব্রিকসের সম্প্রসারিত কাঠামোর সদস্য দেশগুলোর নেতারা ও জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। মূল পাঁচ সদস্য—ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি সম্প্রসারিত জোটে মিশর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে।
প্রথম দিনে “Inclusive Global Governance and Strengthening Multilateralism” শীর্ষক রুদ্ধদ্বার অধিবেশনের মধ্য দিয়ে মূল আলোচনা শুরু হয়।
সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা, মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো এবং ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ আলীসহ বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতারা অংশ নিচ্ছেন।
ব্রাজিলের প্রতিনিধিত্ব করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাউরো ভিয়েরা এবং সৌদি আরবের প্রতিনিধিত্ব করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ।

মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে ব্রিকসের ভূমিকা
ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ তিন দেশকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা এবারের সম্মেলনে ব্রিকসের কূটনৈতিক সক্ষমতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। ভারতীয় কর্মকর্তাদের মতে, নেতারা একটি যৌথ বিবৃতির বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। সম্মেলনের প্রধান কার্যক্রম শেষে বিবৃতিটি প্রকাশের কথা রয়েছে।
ব্রিকসের আলোচনায় শুধু রাজনৈতিক সংকট নয়, সংঘাতের কারণে তৈরি জ্বালানি ও অর্থনৈতিক ঝুঁকিও গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদক ও ভোক্তা দেশগুলোর অংশগ্রহণের কারণে জ্বালানি নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।

অর্থনীতি, উদ্ভাবন ও বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা
দ্বিতীয় দিনে “Resilience, Innovation, Cooperation and Sustainability: Shaping the Future for Inclusive Global Growth” শীর্ষক উন্মুক্ত অধিবেশনে নেতারা অংশ নেবেন।
এ ছাড়া ব্রিকস নেতাদের Bharat Innovates Exhibition পরিদর্শন, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আয়োজিত নৈশভোজে অংশ নেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে।
ব্রিকসের অংশীদার দেশগুলোর মধ্যেও রয়েছে বেলারুশ, বলিভিয়া, কাজাখস্তান, কিউবা, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, থাইল্যান্ড, উগান্ডা, উজবেকিস্তান ও ভিয়েতনাম। অংশীদার দেশগুলোর শীর্ষ প্রতিনিধিরাও এবারের সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন।
ব্রিকসের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জোটভুক্ত দেশগুলো বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৪৯.৫ শতাংশ জনসংখ্যা, ৪০ শতাংশ বৈশ্বিক জিডিপি এবং ২৬ শতাংশ বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রতিনিধিত্ব করে।
ফলে ইরান যুদ্ধ, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত, জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যকার এই সম্মেলন শুধু সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা নয়, বরং পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় ব্রিকসের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এর আগে ২০২৫ সালে ব্রিকসের সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরোতে।





