হুথি হামলার পর সৌদি আরবের পাশে পাকিস্তান, কূটনৈতিক সমর্থনের পাশাপাশি আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ–ক্রাউন প্রিন্স সালমানের আলোচনা
ইসলামাবাদ, পাকিস্তান | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
সৌদি আরবের ওপর সাম্প্রতিক হুথি হামলার পর দেশটির প্রতি পূর্ণ সংহতি ও সমর্থন প্রকাশ করেছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সৌদি ক্রাউন প্রিন্স ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে ফোনালাপে সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রতি পাকিস্তানের দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করার পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ায় চলমান উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন।
রোববার অনুষ্ঠিত ওই ফোনালাপে শাহবাজ শরিফ বলেন, হুথিদের সাম্প্রতিক হামলা শুধু সৌদি আরবের নিরাপত্তার জন্যই নয়, বরং আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যও গুরুতর হুমকি তৈরি করছে। একই সঙ্গে এসব হামলার কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা আরও বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, শাহবাজ শরিফ সৌদি নেতৃত্ব ও দেশটির জনগণের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করে সৌদি বেসামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোর ওপর হামলার নিন্দা জানিয়েছেন।

তেল সরবরাহ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলার পর বৈশ্বিক তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর আগে ইরাক থেকে চালানো একটি ড্রোন হামলার পর সৌদি আরব সাময়িকভাবে প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন বন্ধ করে দেয়।
এই পাইপলাইন সৌদি আরবের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প রপ্তানি পথ। এর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে লোহিত সাগরের উপকূলে তেল পরিবহন করা সম্ভব হয়। ফলে আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোতে আরও চাপ তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে উদ্বেগ রয়েছে।
সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার হুথিদের ছোড়া একটি প্রজেক্টাইল হামলায় দুইজন আহত হন এবং একটি মসজিদসহ বেশ কয়েকটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর ও জ্বালানি স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
উত্তেজনা কমাতে পাকিস্তানের কূটনৈতিক উদ্যোগ
ফোনালাপে শাহবাজ শরিফ জানান, তিনি, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং উপপ্রধানমন্ত্রী ইশাক দার পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা কমানো এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবেন।
সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তানের উদ্যোগের প্রশংসা করেন। দুই নেতা ভবিষ্যতেও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখার বিষয়ে একমত হন এবং শিগগিরই সাক্ষাতের আশা প্রকাশ করেন।

পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি ঘিরে নতুন কূটনৈতিক গুরুত্ব
হুথি হামলার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে গত ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। চুক্তিটির মূল কাঠামো অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনার নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ ৯ সেপ্টেম্বর বলেছিলেন, চুক্তিটির প্রতিশ্রুতি নিয়ে কোনো অস্পষ্টতা থাকা উচিত নয়। কোনো সদস্য দেশের ওপর বিনা উসকানিতে হামলা অথবা ইয়েমেনের সংঘাত সৌদি ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়লে চুক্তির যৌথ প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত বিধান সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এর আগে সৌদি আরবের ওপর হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় অন্তত ৭৩ জন বেসামরিক ব্যক্তি আহত হওয়ার খবরের পরও চুক্তিটির বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসলামাবাদ সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে কূটনৈতিক সমর্থন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং উত্তেজনা প্রশমনের ওপর জোর দিচ্ছে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তায় পাকিস্তানের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান
শাহবাজ শরিফ ও মোহাম্মদ বিন সালমানের সাম্প্রতিক ফোনালাপ থেকে স্পষ্ট যে, পাকিস্তান সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রতি তার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন বজায় রাখছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনকেন্দ্রিক সংঘাত যেন বৃহত্তর পশ্চিম এশিয়ায় ছড়িয়ে না পড়ে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি না হয়, সে বিষয়েও ইসলামাবাদ গুরুত্ব দিচ্ছে।
সার্বিকভাবে, হুথি হামলার পর সৌদি-পাকিস্তান যোগাযোগ শুধু দুই দেশের পারস্পরিক নিরাপত্তা সম্পর্কের গুরুত্বই তুলে ধরছে না; বরং পশ্চিম এশিয়ার ক্রমবর্ধমান সংঘাতের মধ্যে পাকিস্তানের কূটনৈতিক ভূমিকা, সৌদি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা—এই তিনটি বিষয়কে একই সমীকরণে নিয়ে এসেছে।
তথ্যসূত্র: পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও PTI-এর তথ্য সংযোজিত।





