সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলার পর ইয়েমেনের হুতিদের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য ইসলামি প্রজাতন্ত্রী ইরানকে সতর্ক করল পাকিস্তান
ইসলামাবাদ | ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ধারাবাহিক হামলা ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে হুতিদের হামলা বন্ধে তাদের ওপর প্রভাব খাটাতে ইসলামি প্রজাতন্ত্রী ইরানকে সতর্ক করেছে পাকিস্তান। সৌদি আরবের পক্ষ থেকে ইসলামাবাদ তেহরানের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দিয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
রয়টার্স পাকিস্তানি, সৌদি ও ইরানি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, সৌদি আরবের ওপর হুতিদের সাম্প্রতিক হামলার পর গত ২৪ ঘণ্টায় পাকিস্তান ইরানকে হুতিদের নিয়ন্ত্রণে আনার আহ্বান জানায়। ইসলামাবাদের লক্ষ্য হলো, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই উত্তেজনা কমানো, যাতে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় পাকিস্তানকে সরাসরি সামরিক ভূমিকা নিতে হয়।
সৌদি আরবে হুতিদের হামলা
মঙ্গলবার হুতিরা সৌদি আরবের খামিস মুশাইত শহরের একটি বিমানঘাঁটি এবং আশপাশের এলাকায় তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ঘটনায় ৭৩ জন আহত হন। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সৌদি ভূখণ্ডে এটিকে অন্যতম বড় হুতি হামলা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর পরদিন হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি দাবি করেন, গত ১২ ঘণ্টায় ইয়েমেনের বিভিন্ন প্রদেশে সৌদি যুদ্ধবিমান ৫৪টি বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার “জবাব দেওয়া হবে এবং শাস্তি দেওয়া হবে” বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। একই সময়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেও উপসাগরীয় অঞ্চলের জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি সরবরাহকে কেন্দ্র করে সামরিক উত্তেজনা বাড়ছে।
ইরানের কাছে পাকিস্তানের বার্তা
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের একজন জ্যেষ্ঠ আঞ্চলিক কূটনীতিক ইরানের কাছে সৌদি আরবের বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। তেহরানকে হুতিদের ওপর নিজেদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে সৌদি ভূখণ্ডে হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তবে ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পাকিস্তানের বার্তার জবাবে বলেছেন, “ইরান হুতিদের নিয়ন্ত্রণ করে না।”
অন্যদিকে, রয়টার্সকে দুটি পৃথক ইরানি সূত্র জানিয়েছে, গত সপ্তাহে তেহরান হুতিদের সৌদি আরবে হামলা চালানোর নির্দেশ দিয়েছিল। তাদের দাবি অনুযায়ী, ইরান অতিরিক্ত অর্থ ও অস্ত্র দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কয়েকজন কমান্ডার হামলা সমন্বয়ে সহায়তা করতে ইয়েমেনে গেছেন। এসব দাবির বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্ক প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রভাব
সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলার বিষয়টি পাকিস্তানের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ রিয়াদ ও আঙ্কারার সঙ্গে সম্প্রতি একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যুক্ত হয়েছে ইসলামাবাদ।
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, একটি দেশের ওপর আগ্রাসনকে তিনটি দেশের ওপর আগ্রাসন হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তিনি আরও বলেছেন, সৌদি আরবের ওপর কোনো উসকানিবিহীন হামলা বা সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে চুক্তিটি কার্যকর হতে পারে।
তবে পাকিস্তানের কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন, তাদের সামরিক ভূমিকা মূলত সৌদি ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
রয়টার্সের কাছে পাকিস্তানি একটি সূত্র জানিয়েছে, সৌদি কর্মকর্তারা রিয়াদে পাকিস্তান ও তুরস্কের সামরিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিয়ে সমন্বয় করেছেন। বৈঠকে তিন দেশ নীতিগতভাবে একমত হয়েছে যে তাদের সেনারা ইয়েমেনে প্রবেশ করবে না এবং সম্ভাব্য কোনো প্রতিক্রিয়া সৌদি ভূখণ্ড থেকেই পরিচালিত হবে।

পাকিস্তান কি সরাসরি যুদ্ধে যাবে?
আরেক পাকিস্তানি সূত্র জানিয়েছে, সৌদি আরবের পাল্টা সামরিক অভিযানে পাকিস্তান সরাসরি অংশ নেবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
সূত্রটির মতে, সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তিটি মূলত প্রতিরক্ষামূলক। সৌদি ভূখণ্ড রক্ষায় পাকিস্তানি বাহিনী সামরিক, প্রযুক্তিগত, স্থল বা আকাশ সহায়তা দিতে পারে; তবে বিদেশের মাটিতে সরাসরি যুদ্ধ অভিযানে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা নেই।
একজন পাকিস্তানি আঞ্চলিক কূটনীতিকও বলেছেন, ইসলামাবাদ আপাতত কূটনৈতিক সমাধানের পথেই এগোতে চায়। তার ভাষায়, পাকিস্তান আশা করছে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যাবে না, যেখানে সৌদি আরবকে রক্ষায় ইসলামাবাদকে বাস্তবে সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে হবে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নতুন সমীকরণ
বিশ্লেষকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হুতি-সৌদি সংঘাত এখন শুধু ইয়েমেনকেন্দ্রিক সামরিক উত্তেজনা নয়; এটি সৌদি আরব, পাকিস্তান, তুরস্ক ও ইরানের মধ্যকার আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণেও প্রভাব ফেলতে পারে।
পাকিস্তান ঐতিহাসিকভাবে সৌদি আরব ও ইরান—দুই দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রেখে এসেছে। ফলে ইসলামাবাদের সাম্প্রতিক সতর্কবার্তা একদিকে রিয়াদের নিরাপত্তা উদ্বেগ মোকাবিলা করার চেষ্টা, অন্যদিকে সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়া এড়ানোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
রয়টার্সকে দেওয়া এক আঞ্চলিক কূটনীতিকের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান ও হুতিদের ওপর চাপ প্রয়োগের বর্তমান কৌশল উল্টো সৌদি আরব, পাকিস্তান, তুরস্কসহ যুক্তরাষ্ট্রঘনিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সহযোগিতা তৈরি করতে পারে।
এ অবস্থায় হুতিদের হামলা অব্যাহত থাকে কি না এবং সৌদি আরব কী ধরনের পাল্টা ব্যবস্থা নেয়—তার ওপরই নির্ভর করবে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তি বাস্তবে কতটা সক্রিয় হয়ে ওঠে।
সূত্র: রয়টার্স





