অত্যন্ত অশান্ত সময়ে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন-প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একসঙ্গে থাকতে হবে - রাশিয়ান হাউসের পরিচালক ড. এলেনা
নয়াদিল্লি, ভারত | ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | দ্য গ্লোবাল জার্নাল
আগামী বছর ভারত ও রাশিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্কের ৮০ বছর পূর্তি হতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়ে রাশিয়ান হাউসের পরিচালক ড. এলেনা রেমিজোভা বলেছেন, বর্তমান অশান্ত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে ব্রিকস সদস্যদের পাশাপাশি ভারত ও রাশিয়ার জনগণের মধ্যকার যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক বিনিময়, শিক্ষা ও ব্যবসায়িক সহযোগিতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনের সাইডলাইনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠকের পর ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক নিয়ে এসব মন্তব্য করেন রেমিজোভা। তাঁর বক্তব্য Firstpost-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত হয়েছে।
‘অশান্ত সময়ে একসঙ্গে থাকতে হবে’
ড. রেমিজোভার মতে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ব্রিকস দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য ও সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি জনগণের মধ্যে যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক সম্পর্ক, শিক্ষা, বিজ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা, ধারণা ও মানুষের আদান-প্রদান জোরদার করা প্রয়োজন।
ব্রিকসের ‘সিভিল ফোরাম’-এর কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিভিন্ন এনজিও ও জনসংগঠন জনগণের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করতে পারে। একই সঙ্গে তরুণদের পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
রাশিয়ান হাউসের পরিচালক জানান, রাশিয়া ভ্রমণে ভারতীয় তরুণদের আগ্রহ বাড়ছে। তাদের জন্য রাশিয়ান হাউসের পক্ষ থেকে বিশেষ কিছু কর্মসূচিও পরিচালনা করা হচ্ছে। একইভাবে রাশিয়ার তরুণদের মধ্যেও ভারত সম্পর্কে আগ্রহ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

রুপি-রুবলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ
ব্রিকস সম্মেলনের সাইডলাইনে ভারত মণ্ডপমে আয়োজিত INNOPROM প্রদর্শনীতে রুশ ও ভারতীয় ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ নিয়েও সন্তোষ প্রকাশ করেন রেমিজোভা।
তিনি বলেন, রুশ কোম্পানিগুলোর মধ্যে ভারতে এসে পণ্য প্রদর্শন এবং ভারতীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনে উল্লেখযোগ্য আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। একইভাবে ভারতীয় কোম্পানিগুলোর মধ্যেও রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসা করার আগ্রহ রয়েছে বলে তিনি জানান।
রেমিজোভা বিশেষভাবে জাতীয় মুদ্রায় লেনদেনের বিষয়টি তুলে ধরেন। তাঁর মতে, রুপি-রুবল পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে দুই দেশের ব্যবসায়িক লেনদেন আরও সহজ করার সুযোগ রয়েছে।
রাশিয়ার ব্যবসায়ীরা ভারতে বিনিয়োগে আগ্রহী এবং ভারতীয় ব্যবসায়ীদের রাশিয়ায় বিনিয়োগেরও সুযোগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান ব্যবসায়িক সহযোগিতাকে আরও বিস্তৃত করার প্রয়োজন রয়েছে বলেও জানান তিনি।
৮০ বছরের কূটনৈতিক সম্পর্ক
২০২৭ সালে ভারত ও রাশিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্কের ৮০ বছর পূর্তি উপলক্ষে দুই দেশের সাংস্কৃতিক সম্পর্কের বিষয়টিও তুলে ধরেন ড. রেমিজোভা।
তিনি ১৯৮৬ ও ১৯৮৭ সালে ভারত ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে আয়োজিত বড় ধরনের সাংস্কৃতিক উৎসবের কথা স্মরণ করেন। তাঁর মতে, ওই আয়োজনগুলো দুই দেশের জনগণের মধ্যে সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
বর্তমান সময়েও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক দল ও সংগীতশিল্পীদের আদান-প্রদানের বিষয়ে আন্তঃসরকারি ব্যবস্থাও রয়েছে।
রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের নৃত্য, সংগীত, গান ও স্থানীয় ঐতিহ্য ভারতে তুলে ধরার পাশাপাশি ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গেও রুশ জনগণের পরিচয় আরও গভীর করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বহুমেরু বিশ্বে ভারতের ভূমিকা
আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ভারত ও রাশিয়ার ভূমিকা প্রসঙ্গে ড. রেমিজোভা ভারতকে একটি ‘সভ্যতাগত রাষ্ট্র’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ভারতের দীর্ঘ ইতিহাস ও সভ্যতাগত ঐতিহ্য দেশটির আন্তর্জাতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর মতে, হাজার বছরের ঐতিহ্য ধরে রেখে আধুনিকতার সঙ্গে এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে ভারতের অভিজ্ঞতা উল্লেখযোগ্য।
ভারতীয় শিল্প ও সংস্কৃতির প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশটির শিল্পীরা আধুনিক বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেও তাদের কাজের মধ্যে ভারতীয় ঐতিহ্যের প্রভাব বজায় থাকে।
রেমিজোভার মতে, দীর্ঘ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কারণে ভারত বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখছে।
মোদি-পুতিন বৈঠক ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক
১৮তম ব্রিকস সম্মেলনের সাইডলাইনে মোদি-পুতিন বৈঠকে ভারত ও রাশিয়ার দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে আরও গভীর করার বিষয়ে আলোচনা হয়। দুই দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের পাশাপাশি জনগণের মধ্যে যোগাযোগও ভবিষ্যৎ সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে উঠে আসছে।
ড. রেমিজোভার বক্তব্যে বিশেষভাবে অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি শিক্ষা, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি, তরুণদের যোগাযোগ এবং ব্যবসায়িক বিনিয়োগের মতো ক্ষেত্রগুলোতে ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক বিস্তারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আগামী বছর কূটনৈতিক সম্পর্কের ৮০ বছর পূর্তি উপলক্ষে দুই দেশের এই বহুমাত্রিক সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট আলোচনায় উঠে এসেছে।





