সৌদি আরবের আকাশে হুথিদের ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র হা'ম'লা -নিরব ভুমিকায় পাকিস্তান।হুথি হামলায় পরীক্ষার মুখে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি
রিয়াদ/ইসলামাবাদ | ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বাহিনীর ধারাবাহিক ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা আক্রান্ত হওয়ার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট। চুক্তিটি স্বাক্ষরের মাত্র এক মাসের মধ্যে এমন হামলা জোটটির সম্মিলিত প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
৮ সেপ্টেম্বরের হামলায় সৌদি আরবের আবহা, খামিস মুশাইত, জিজান ও নাজরানসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করা হয়। সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, হামলায় ৭৩ জন আহত হয়েছেন এবং কয়েকটি জ্বালানি স্থাপনায় আগুন ও সাময়িক কার্যক্রম বন্ধের ঘটনা ঘটেছে। জিজানে সৌদি আরামকোর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যে ছিল।
হুথিদের এই নতুন আক্রমণ শুধু সৌদি আরবের নিরাপত্তার জন্য নয়, দেশটির নতুন প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ৭ আগস্ট মক্কায় সৌদি ক্রাউন প্রিন্স ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রجب তাইয়্যিপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর করেন। চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
তবে এই ধারাটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্দিষ্ট সামরিক বাহিনী বা সেনা মোতায়েনের নিশ্চয়তা দেয় না। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান জানিয়েছেন, আক্রান্ত দেশকে সহায়তার প্রয়োজন হলে তা কী ধরনের হবে, সেটি পরিস্থিতি ও আক্রান্ত দেশের অনুরোধের ওপর নির্ভর করবে। ফলে চুক্তির রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তব সামরিক প্রতিক্রিয়ার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।

পাকিস্তানের সামনে কঠিন ভারসাম্য
সৌদি আরবের ওপর সরাসরি হামলার পর স্বাভাবিকভাবেই ইসলামাবাদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তবে পাকিস্তানের জন্য ইয়েমেন ইস্যুটি নতুন নয়। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেনের যুদ্ধে সরাসরি সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়া এড়িয়ে এসেছে এবং আঞ্চলিক সংঘাতে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়েছে।
অন্যদিকে, মক্কা চুক্তিতে পাকিস্তান সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামোর অংশ হয়েছে। ৩১ আগস্ট ইস্তাম্বুলে চুক্তির অধীনে প্রথম Strategic Political and Defence Committee বৈঠকে তিন দেশ সহযোগিতা আরও প্রাতিষ্ঠানিক করার সিদ্ধান্ত নেয়। সেখানে যৌথ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং সামরিক সহযোগিতা জোরদারের পাশাপাশি আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো ও সংযমের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও চুক্তিটিকে প্রতিরক্ষামূলক হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং জানিয়েছে, এর লক্ষ্য কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে সংঘাত সৃষ্টি করা নয়; বরং বহিঃআক্রমণের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ানো।

কেন এই হামলা গুরুত্বপূর্ণ?
হুথিদের হামলা এমন সময়ে ঘটছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ইতোমধ্যেই তীব্র। সৌদি জ্বালানি অবকাঠামোয় নতুন হামলা আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রভাব ফেলেছে। হামলার পর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৯৮ ডলারে উঠে যায়, যা উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি সরবরাহ ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এই পরিস্থিতিতে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—সৌদি আরবের ওপর সরাসরি হামলার ক্ষেত্রে পাকিস্তান ও তুরস্ক কী ধরনের রাজনৈতিক, গোয়েন্দা, প্রতিরক্ষা বা সামরিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত। চুক্তি কার্যকর হওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়া জোটটির ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া সরকারি বিবৃতিগুলো থেকে সরাসরি পাকিস্তানি সামরিক হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্তের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং তিন দেশই চুক্তির কাঠামোর মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে।
বিশ্লেষকদের জন্য মূল প্রশ্ন এখন একটাই—মক্কা চুক্তি কি শুধু একটি কৌশলগত প্রতিরোধমূলক কাঠামো, নাকি সৌদি আরবের ওপর বড় ধরনের হামলার ক্ষেত্রে এটি বাস্তব সম্মিলিত সামরিক প্রতিক্রিয়ায় রূপ নেবে?





