জাতিসংঘের বিপুল সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি, দ্বৈতনীতি ও আধিপত্যবাদ প্রত্যাখ্যান করে সম্ভাবনা কাজে লাগান -SCO নেতাদের আহ্বান
— গ্লোবাল জার্নাল | বিশকেক | ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিশ্বব্যবস্থায় জাতিসংঘের ভূমিকা আরও কার্যকর ও প্রতিনিধিত্বশীল করার আহ্বান জানিয়েছেন শাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (SCO)-এর নেতারা। বিশকেকে অনুষ্ঠিত SCO Plus বৈঠকে রাশিয়া, চীন, বেলারুশ, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান ও কাজাখস্তানের নেতারা জাতিসংঘের সংস্কার, বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, জাতিসংঘের বিপুল সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি। তার মতে, পরিবর্তিত বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাতিসংঘকে আরও কার্যকর করে তুলতে হবে।
জাতিসংঘের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর আহ্বান পুতিনের
পুতিন বলেন, জাতিসংঘের কার্যক্রম নিয়ে সবসময় সবাই সন্তুষ্ট না হলেও এই সমস্যা নতুন নয়। তবে তিনি মনে করেন, সংস্থাটির কার্যকারিতা বাড়াতে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বৈশ্বিক দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে যে মৌলিক পরিবর্তন ঘটছে, তার সঙ্গে জাতিসংঘের কাঠামোকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
পুতিন আরও বলেন, একটি ন্যায়সংগত বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া বাস্তব এবং এটি থামানো সম্ভব নয়। বিভিন্ন রাষ্ট্রের স্বার্থ সমন্বয়ের ক্ষেত্রে জাতিসংঘকেই প্রধান আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ধরে রাখা প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
‘জঙ্গলের আইন’ ও দ্বৈতনীতি প্রত্যাখ্যানের আহ্বান শি জিনপিংয়ের
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন, বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার বিকাশ এখন একটি অপরিবর্তনীয় ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া।
তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি তথাকথিত ‘জঙ্গলের আইন’, দ্বৈতনীতি, আধিপত্যবাদ, হস্তক্ষেপ ও শক্তির দাপট প্রত্যাখ্যানের আহ্বান জানান। তার মতে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে আরও গণতান্ত্রিক করতে এবং মানবজাতির অভিন্ন মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় দেশগুলোর একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন।
শি বলেন, SCO ইউরেশিয়ার দেশগুলোর যৌথ উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের কর্তৃত্ব ও কার্যকারিতা পুনরুদ্ধারে SCO সদস্যদের সম্মিলিত ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।

জাতিসংঘকে পুনরুজ্জীবিত করতে চায় বেলারুশ
বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো বলেন, ভবিষ্যতে SCO জাতিসংঘকে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি জাতিসংঘকে বৈশ্বিক সমস্যার সমাধানের একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পুনরুজ্জীবিত করার আহ্বান জানান। তার মতে, সংস্থাটিকে কোনো নির্দিষ্ট শক্তির চাপ বা প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
লুকাশেঙ্কো আরও বলেন, জাতিসংঘ সংস্কারের ক্ষেত্রে শুধু নেতৃত্বের পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংলাপ ও দায়িত্বশীল আচরণের সংস্কৃতি গড়ে তোলাও জরুরি।
একই সঙ্গে একতরফা অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা, পারস্পরিক বিনিয়োগ, কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজীকরণ, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং পরিবহন যোগাযোগ উন্নয়নে SCO-এর সক্রিয় ভূমিকার পক্ষে মত দেন তিনি।
ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্বব্যবস্থার আহ্বান রাহমনের
তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রাহমন বলেন, জাতিসংঘ ও SCO অভিন্ন মূল্যবোধ এবং গঠনমূলক সহযোগিতার ভিত্তিতে একটি ন্যায্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই বিশ্বব্যবস্থা গঠনে আরও বড় ভূমিকা পালন করতে পারে।
তিনি দুই সংগঠনের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন এবং বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
জাতিসংঘকে আরও কার্যকর করার পক্ষে জাপারভ
কিরগিজস্তানের প্রেসিডেন্ট সাদির জাপারভ বলেন, জাতিসংঘ নিখুঁত কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। তবে এর সীমাবদ্ধতাকে সংস্থাটির ভূমিকা কমিয়ে দেওয়ার কারণ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
তার মতে, বরং বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাতিসংঘকে আরও কার্যকর, শক্তিশালী ও আধুনিক করা প্রয়োজন।
‘শক্তির পূজা’ বন্ধের আহ্বান তোকায়েভের
কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভ এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান, যেখানে শক্তির প্রদর্শন ও সংঘাতের পরিবর্তে পারস্পরিক দায়িত্ব, যৌথ উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা প্রাধান্য পাবে।
তিনি জাতিসংঘকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে ধরে রাখার ওপর জোর দেন এবং সংস্থাটির মৌলিক নীতিগুলো আরও কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।

বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে SCO নেতাদের অভিন্ন বার্তা
SCO Plus বৈঠকের আলোচনায় আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে নেতাদের বক্তব্যে বেশ কিছু অভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে। তারা জাতিসংঘের কার্যকারিতা ও প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, আন্তর্জাতিক সম্পর্কে দ্বৈতনীতি ও একতরফা আধিপত্যের অবসান এবং সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা ও সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
SCO নেতাদের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, তারা বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে আরও বহুমেরু, প্রতিনিধিত্বশীল ও বহুপক্ষীয় কাঠামোর দিকে এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে। জাতিসংঘের সংস্কার ও শক্তিশালীকরণকে সেই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছেন তারা।
— গ্লোবাল জার্নাল | বিশকেক | ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সূত্র: তাস (TASS)





